বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন (পাঠ- ১)

অষ্টম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় - ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম | NCTB BOOK
8.5k
Summary

উপনিবেশিকরণ হল একটি প্রক্রিয়া যাতে অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে এক দেশ অন্য দেশের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করে। এই প্রক্রিয়ার ফলে দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। বাংলা দুইশ বছর ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল, যা ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয় এবং ১৯৪৭ সালে শেষ হয়।

বাংলার প্রাচীন রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বাংলা বিভিন্ন শাসকদের অধীনে ছিল। এই শাসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

  • মৌর্য সম্রাট অশোক
  • গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসকরা
  • শশাঙ্ক এবং বঙ্গ রাজ্য
  • সেন রাজারা
  • মুসলিম শাসক যেমন বখতিয়ার খলজি এবং ইলিয়াস শাহ
  • মোগল সম্রাটরা

১৫৩৮ সালে বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে এবং ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। বাংলায় উপনিবেশিক শাসনের বিষয়টি জানার জন্য পূর্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।

কাজ-১: ঔপনিবেশিক শাসন বলতে অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে একটি দেশের অন্য দেশের উপর প্রতিষ্ঠা লাভ বোঝায়।

কাজ-২: খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত বাংলার শাসকদের পর্যায়ক্রমিক তালিকা তৈরি করলে তা হবে:

  • মৌর্য সাম্রাজ্য
  • গুপ্ত সাম্রাজ্য
  • শশাঙ্ক
  • সেন রাজারা
  • বখতিয়ার খলজি
  • ইলিয়াস শাহ
  • মোগল রাজা (হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর)
  • ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তি

উপনিবেশিকরণ একটি প্রক্রিয়া। সাধারণভাবে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক শোষণ ও লাভের উদ্দেশ্যে এক দেশ অন্য দেশের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করে তাকে নিজের দখলে আনে। অধীনস্থ দেশটির জনগণ, সম্পদ সবকিছুই অধিপতি দেশটি নিজের স্বার্থ অনুযায়ী পরিচালনা করে। এখানে দখলকৃত দেশটি দখলকারী দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। বাংলা প্রায় দুইশ বছর এমনভাবে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই শাসনের সূচনা হয়েছিল যা নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে শেষ হয় । কীভাবে এই ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল তা জানার আগে সেইসময় বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল তা কিছুটা জেনে নেয়া দরকার। বাংলার রাজনৈতিক পটভূমি: ঔপনিবেশিক শাসন-পূর্বকাল প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা অঞ্চলে মানব বসতির কথা জানা যায়। এ অঞ্চলটি বরাবরই ছিল ধনসম্পদে পূর্ণ একটি এলাকা । ফলে ইংরেজ আগমনের অনেক আগে থেকেই এখানে বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আগমন ঘটতে থাকে। সকলের আকর্ষণের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলার অর্থনৈতিক প্রাচুর্য। কাজেই বহিরাগতের আগমন বাংলার ইতিহাসের নতুন কোনো ঘটনা নয়।

খ্রিষ্টপূর্ব যুগে বহিরাগত আর্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বাংলায় প্রবেশ করেছিল । খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে বাংলার উত্তরাংশ দখল করেন ভারতের মৌর্য সম্রাট অশোক। সে সময় পুন্ড্রনগর (পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি) হয় মৌর্যদের প্রদেশ। মৌর্যদের পর ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় গুপ্ত সাম্রাজ্য। চার শতকে উত্তর বাংলা ও দক্ষিণ-পূর্ব-বাংলার কিছু অংশ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারে আসে। গুপ্তদের পতনের পর সপ্তম শতকে বাংলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম বাঙালি শাসক শশাঙ্ক কর্তৃক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বঙ্গ নামে আরেকটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুর পর একশো বছর ধরে বাংলায় অরাজকতা চলতে থাকে। যাকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় মাৎস্যন্যায় যুগ। এরপর বাঙালিদের দীর্ঘস্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় আট শতকের মাঝ পর্বে। প্রায় চারশো বছর বাংলাকে শাসন করেন বাঙালি পাল রাজারা। পালদের পতনের পর এগারো শতকের শেষ দিকে আবার বিদেশি শাসনের অধীনে চলে যায় বাংলা। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজারা বাংলার সিংহাসন দখল করে নেন।

সেন শাসনের অবসান ঘটে ভাগ্যান্বেষণে আগত তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির হাতে। তিনি রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন। ১২০৪ থেকে ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার পশ্চিমে নদীয়া ও উত্তর বাংলার কিছুটা অংশ বখতিয়ার খলজির দখলে ছিল। নদীয়া ও উত্তর বাংলায় তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলার পূর্বাঞ্চল (বিক্রমপুর) আরও অনেক সময় পর্যন্ত সেন শাসকদের অধীনে ছিল । বিহার অভিযানে ব্যর্থতার পর ১২০৬ সালে বখতিয়ার খলজি মারা যান। তবে তাঁর মাধ্যমে বাংলায় তুর্কি সুলতানদের শাসনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল । তারপর ১৩৩৮ সাল পযন্ত বাংলা জুড়ে মুসলিম শাসনের বিস্তার ঘটতে থাকে।

এ সময়ের মধ্যে বাংলার তিনটি অংশে দিল্লি সালতানাতের তিনটি প্রদেশ বা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিভাগগুলো উত্তর বাংলায় লখনৌতি, পশ্চিম বাংলায় সাতগাঁও এবং পূর্ব বাংলায় সোনারগাঁও নামে পরিচিত ছিল । ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এভাবে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনা হয়। তবে সমগ্র বাংলার এক বৃহদাংশ অধিকার করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার মাধ্যমে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন বলে ধরা হয়। ইলিয়াস শাহ ‘শাহ-ই-বাঙ্গালা’ ও ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি ধারণ করেন । স্বাধীন সুলতানি আমলের অপর অন্যতম উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা শিল্প, সাহিত্যের বিকাশে তাঁর অবদান অপরিসীম। যাহোক, ১৫৩৮ সালে অবসান ঘটে বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের। অবশ্য এর আগেই মোগল শক্তি দিল্লির সিংহাসন দখল করেছিল। মোগল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ সালে উত্তরবাংলার গৌড় অর্থাৎ লখনৌতি দখল করলেও বাংলায় তখন মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। এর কারণ, বিহারের আফগান শাসক শের খান হুমায়ুনকে প্রথমে বাংলা ও পরে ভারত থেকে বিতাড়িত করেন। এ পর্বে বাংলার শাসন ক্ষমতা আফগানদের হাতে চলে যায় ।

ভারতে মোগলরা আবার সংগঠিত হয় এবং রাজমহলের যুদ্ধে আফগানদের পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। এরপর সম্রাট আকবরের সময় ১৫৭৬ সালে পশ্চিম বাংলা ও উত্তর বাংলার অনেকটা অংশ মোগলদের অধিকারে আসে। বাংলার পূর্বাংশ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ অংশ সহজে মোগলরা দখল করতে পারে নি। বারোভূঁইয়া নামে পরিচিত পূর্ববাংলার জমিদাররা একযোগে মোগল আক্রমণ প্রতিহত করেন। আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কয়েকবার চেষ্টা করেও বারোভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁকে পরাজিত করতে পারেন নি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি চূড়ান্তভাবে বারোভূঁইয়াদের পরাজিত করে ঢাকা অধিকার করেন এবং তৎকালীন দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে জাহাঙ্গীরনগর নামকরণ করেন। এভাবেই বাংলায় মোগল অধিকার সম্পন্ন হয়। এই মোগল শাসন চলে আঠারো শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে মোগল শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। সেই সাথে বাংলার ক্ষমতা দখল করে ইংরেজ শক্তি। আর এভাবেই শুরু হয় ঔপনিবেশিক শক্তির শাসন।

কাজ-১ : ঔপনিবেশিক শাসন বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো ।

কাজ-২ : খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত বাংলার শাসকদের পর্যায়ক্রমিক তালিকা তৈরি করো।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...